New User? | Forgot Password

Prose Library - Today's featured Prose

হুইসেল
কেয়া চ্যাটার্জী
“একেলে একেলে কাঁহা যা রাহে হো, হমে সাথ লে লো, যাহা যা রহে হো” মেয়েটিকে যতক্ষণ না রাস্তার মোড়ে অদৃশ্য হতে দেখল, রানা ততক্ষণ গানটা হুইসল করতে থাকলো। মেয়েটি বিরক্ত হয়ে একবার তার দিকে শ্যেন দৃষ্টি হেনে রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেল। হা হা হা করে হেসে চায়ের ভাঁড়ে তৃপ্তির চুমুক দিলো রানা। বেশ কদিন ধরে তার এটিই একমাত্র বিনোদন। পাড়ার দাদা হিসেবে খ্যাত বা কুখ্যাত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এলাকার মানুষের মনে ক্ষোভ জমলেও তা আজও উদগীরণ হয়নি। বিল্টুর সাথে সিনেমা নিয়ে কথা বলতে বলতে পা দোলাচ্ছিলো রানা এমন সময় তার সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন মহিলা। পরনে সালোয়ার কামিজ, চুলটা পনি টেল করে বাঁধা তবে উস্কো খুস্কো, পায়ে চপ্পল। রানা এক ঝলক তাকিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্য ভরে বলল, “বলুন মাসিমা, ভাড়াটে ওঠাতে হবে না ভাসুরকে কেলাতে হবে?”
“এই ঠিকানায় সন্ধে বেলা আসতে হবে। তারপর সেখানেই কাজ বলব খন।”
রানা একটা ধাক্কা খেল যেন, মুখ তুলে তাকাল মহিলার দিকে। প্রসাধন হীন, ভাবুক চেহারা, চোখ দুটো যেন অন্তর অবধি প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে।
“আপনার নাম?” বললো রানা
“সবিতা সেন। ”
রানার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে হন হন করে হাঁটা লাগলেন তিনি হাউসিং এর দিকে। বিল্টু ফিসফিস করে বলল, “রানা দা বড় পার্টি মনে হচ্ছে। মার্ডার কেস নয়তো? সেসব হলে কিন্তু আমি নেই বলে দিলাম।”
রানা বিরক্ত হয়ে বলল, “ঠিক আছে ঠিক আছে দেখা যাক না কি হয়। ছটার মধ্যে রেডি থাকবি কিন্তু।”
সন্ধে ছটা পনের নাগাদ রানা আর বিল্টু কার্ডে উল্লিখিত ঠিকানায় পৌছল। B1 tower এর চারতলার দু নম্বর ফ্ল্যাট। কলিং বেল টিপতেই দরজা খুললো একটি কুড়ি বাইশ বছরের মেয়ে। পরনে হলুদ তাঁতের শাড়ি, প্রসাধন হীন মুখে কালো টিপটা স্বেচ্ছাচারীর মতো সৌন্দর্য বিস্তার করছে, চোখের কাজল চোখ দুটোকে আরো বুদ্ধিদীপ্ত ও গভীর বানিয়েছে। তার শ্যামলা বর্ণ যেন তাকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছে।
“বলুন কাকে চাইছেন?” মেয়েটির প্রশ্নে সম্বিৎ ফেরে রানার। বুঝতে পারে এতক্ষন সে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে ছিল মেয়েটির দিকে। নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আম…আমায় সবিতা ম্যাডাম ডেকেছেন।”
“কে রে জয়া?” উচ্চস্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সকালের মহিলাটি। এখন তার পরনে একই রকম হলুদ তাঁতের শাড়ি। রানাকে দেখে বললেন, “এসেছেন? খুব খুশি হলাম। বসুন। চা খাবেন তো? জয়া ওদের চা দে।” রানাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে একনাগাড়ে বলে গেলেন সবিতা দেবী আর তার পরেই চলে গেলেন ভেতর ঘরে। বিল্টু সোফায় বসে চারিদিক পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল, “ও রানা দা, গুন্ডাকে বাড়িতে ডেকে কেউ খুশি হয় নাকি গো? এ নিশ্চই বিরাট কিছু গন্ডগোলের কেস।”
“এতই যখন ভয় তখন এ লাইনে এসেছিলি কেন? আর ঘুরবি না আমার সাথে বলে দিলাম।” রানার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বিল্টু একটু মুষড়ে পড়ল।
ইতি মধ্যে তাদের জন্য ট্রে এর উপর চা বিস্কুট সাজিয়ে আনল জয়া। সবিতা দেবী তাকে ডেকেও নিলেন সঙ্গে সঙ্গে। জয়া ভেতর ঘরে চলে গেলে রানা আর বিল্টু নিঃশব্দে চা বিস্কুটে মগ্ন হলো। মিনিটখানেক পরেই জয়া তাদের ডেকে নিল সেই ঘরে। ঘরে ঢুকেই বিল্টুর সাথে রানাও বিস্মিত হয়ে গেল। ঘরটা মোটামুটি বড়। দুদিকে জানলা আর লাগোয়া একটা ব্যালকনি। কোনো আসবাব পত্র নেই বড় ঘরের একপাশে হারমোনিয়াম, কীবোর্ড রাখা তার পাশেই দুজন মহিলা বসে গিটার আর বেহালা হাতে। নিচে বসে আছেন আরেকজন মহিলা তবলা নিয়ে। সবিতা সেন একটা যন্ত্র নিয়ে খুটখাট করছিলেন। রানাকে দেখে হেসে বললেন, “আসুন। আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু বুঝতে পারছেন না। সংক্ষেপে তবে বলি। আমরা কজন সংগীতপ্রেমী মিলে একটি মিউজিক গ্রূপ বানিয়েছি। “সংগীতম” আমাদের গ্রূপের নাম। পুরোটাই মহিলা পরিচালিত। আজ আমাদের একটা গানের রেকর্ডিং আছে। কিছু পুরাতন বাংলা গান আর কি। আপনি সকালে চায়ের দোকানে বসে সিটি বাজাচ্ছিলেন। শুনেই আমার strike করল যদি একটা হুইসেল এড করা যায় গানে তবে দারুন হয়। খুব সুরে হুইসেল করছিলেন আপনি, I must say.. তাই আপনাকে ডেকে নিলাম। এটা মাইক্রোফোন এখানে আপনি হুইসেল করবেন। আমি বলে দেব, ঘাবড়াবার কিছু নেই। রেকর্ডিং হয়ে গেলেই ব্যাস ছুটি।” সবিতা দেবী এবার থামলেন। রানা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এতক্ষন শুনছিল সব। মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সিটি মারতে হবে মাইক হাতে! মহিলা কি পাগল নাকি! এতদিন রানা চৌধুরীকে সবাই চিনে এসেছে গুন্ডা হিসেবে। মারপিট, তোলা আদায়, হুমকি দেওয়া এইসবের জন্যই সে বিখ্যাত। আজ এতগুলো মেয়ের সামনে সে বসে বসে সিটি বাজাবে! কিছুক্ষন স্তম্ভিত হয়ে রানা বললো, “বাথরুমটা কোন দিকে?” একটি মেয়ে তাকে নিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। বাথরুমে ঢুকেই একটা সিগারেট ধরালো রানা। এতটা নার্ভাস তার কখনো লাগেনা এর আগে। এরকম সম্ভ্রম, সম্মান সে এর আগে পায়নি কোথাও। রানা মানেই বোমা, রানা মানেই ডাকাতি, রানা মানেই গুন্ডাগিরি। আর আজ রানা মনে সিটি! ছি রানা ছি! বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা সেই ঘরে গেল রানা। মুখের উপর বলে দেবে সে এসব ন্যাকামি সে পারবে না। রেকর্ডিং সে করবে না। ঘরে ঢুকেই শুনতে পেল সমবেত সংগীত। “ও আকাশ সোনা সোনা, এ মাটি সবুজ সবুজ....” সবিতা দেবী সকলকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, “এই তো রানা বাবু এসে গেছেন। আপনি ঠিক এই লয়ে হুইসেলটা শুরু করবেন।” বলে তিনি গাইতে লাগলেন। রানার বুকটা কেমন মুচড়ে উঠলো। চোখটা জ্বালা করে উঠল। মা এর কথা মনে পড়ছে কেন এখন। গানটা যেন মর্মভেদী। এক লহমায় সব অন্ধকার হয়ে গেল। সব অহংকার, জেদ, হিংসা ম্লান হয়ে গেল। রানা নিঃশব্দে চেয়ারে গিয়ে বসল। সবিতা দেবীর নির্দেশ মতো তিন জায়গায় হুইসেলের পার্ট দিল রানা। তারপর একটা গান পুরোটাই হুইসেল করল। কি এক জাদুবলে সন্ধেটা যেন এক অন্য মাত্রা পেয়ে গেল। কোথায় সেই বদমেজাজি, অহংকারী, খল রানা। সে যেন চার বছর আগের সেই কলেজের নিষ্পাপ ছেলেটি।
খানিকটা বিমোহিত হয়ে টলতে টলতেই বাড়ি পৌছল রানা। আজ সন্ধের ঘোরটা যেন কাটতেই চাইছে না। বাড়ি ফিরে দেখল সারা বাড়িটাই অন্ধকারে মোড়া। সকলে খেয়ে শুয়ে পড়েছে। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত প্রায় এগারোটা। শুয়ে পড়ারই কথা। সকালে উঠে সবারই ব্যস্ততার শেষ নেই। দাদা প্রাইভেট ব্যাংকের বড় অফিসার, বৌদি শিক্ষিকা, ভাইঝিটা ক্লাস ফোরে উঠেছে। পরশুনার চাপ বেড়েছে। সময় নেই তারও। বাবা সদ্য ছমাস হল তার কেরানির চাকরি থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছেন। রানা বাড়ি না ফিরলে শুধু এই একটা লোকের চোখেই ঘুম আসেনা। আজও তার অন্যথা হলো না। গেট টা খুলেতেই বাইরের আলো জ্বলে উঠল। রানা বুঝল বাবা ঘুমাননি। “এত রাত অব্দি জাগো কেন বাবা? শরীর খারাপ করবে যে!”
“বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন রানা। বাবার শরীর ভালো নেই।” বৌদির কণ্ঠস্বরে চমকে উঠলো রানা। বহুদিন পর বৌদি তার জন্য অপেক্ষারত। “কি হয়েছে বাবার?” বলল রানা। “জ্বর।” চিত্রা সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে তালা খুলে দিলো। টেবিলে খাবার বাড়তে বাড়তে বললো, “তোমার সাথে কিছু কথা আছে। বসো।” বৌদির এমন ঠান্ডা ও দৃঢ় কণ্ঠস্বরে রানা বিস্মিত হয়ে পড়ল। কি এমন কথা থাকতে পারে তার সাথে বৌদির। রাজনৈতিক পার্টির সাথে হাত মিলিয়ে পাড়ার দাদা হওয়ার পর থেকে বৌদি প্রায় বছরখানেক হল তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। দাদার সাথে তাও মাসে একবার দুবার সংসার খরচ নিয়ে ঝগড়া হয়। কিন্তু ভাইঝি আর বৌদির সাথে দেখাও হয়না প্রায়। আজ কি এমন দরকার পড়ল বৌদির যে নিজে এসে কথা বলছে! রানা বিস্ময় চেপে রেখে বলল, “হ্যাঁ বলো?” খাবারের থালা এগিয়ে দিয়ে চিত্রা বলল, “তুমি বেকারত্বের সমস্যায় ভুগছ আমরা জানি। উপার্জন না করতে পেরে দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে গেছ, ডিপ্রেশন এসেছে। চাকরি বৃত্তি আর চাকুরীজীবিদের প্রতি ঘৃণা এসেছে। সব কিছু সহানুভূতির সাথে মেনে নিলাম। গুন্ডাগিরি শুরু করলে তাও কিছু বলিনি আমরা। কিন্তু এখন ইভ টিসিং! ছি রানা! বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের দেখে তুমি হুইসেল করছ! কাল ও পাড়ার একটা মেয়েকে আজ আমার ছাত্রীকে! সে আর তার মা বাড়ি এসে যা নয় তা বলে গেলেন। কি পাও এসব করে? আমারও তো একটা মেয়ে আছে রানা। আমি কি তোমায় বিশ্বাস করতে পারি? ” রানা আঁতকে উঠল। “কি বলছো বৌদি! তিন্নি আমার ভাইঝি।” কথাটা বলেই স্তব্ধ হলো সে। এরপরের উত্তরটা অবশ্যম্ভাবী। বাকিরাও তো কারুর না কারুর মেয়ে, বোন, ভাইঝি, বোনঝি। চিত্রা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রানার দিকে। তার দৃষ্টি বড্ড ধারালো ঠেকল রানার চোখে। মাথা নামিয়ে নিল সে। চিত্রা চলে গেলে খাবার টেবিলে একাই বসে রইল রানা। মায়ের সহাস্য ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “হুইসেল করা কি খুব খারাপ মা?”
একমাস পর….
বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য অটো স্ট্যান্ডের পান্ডালে কাজে হাত লাগাচ্ছে রানা। ফলের ঝুড়ি, ফুলের প্যাকেট, ধুপ, মোমবাতি, ঠাকুরের হাতে ঘুড়ি, পুরোহিতের দক্ষিনা সব রানার দায়িত্ব। পুজো কাটলে ঠেক বসানো হবে বলে চারটে বোতলও আছে। যদিও বেশ কদিন ওসব খেতে ইচ্ছে করছেনা ওর। কেন এই পরিবর্তন বুঝতে পারছে না রানা। টিউব লাইট টা ঠিক করতে করতে বিল্টুর ডাকে পিছন ফিরতেই চোখাচুখি হলো জয়ার সাথে। সেই সহাস্য মুখ। চোখে গভীরতা। নিমেষে অস্থির পরিবেশটা নরম আলোয় ভরে গেল। পাখিরা ডেকে উঠল দূর দিগন্তে। ঝর্নার কল কল ধ্বনি শোনা গেল যেন। “রানাদা উনি তোমায় কিছু দিতে এসেছেন।” বিল্টুর কথায় সম্বিৎ ফেরে রানার। “দিতে? হ্যাঁ বলুন না।” জয়া নিঃশব্দে একটি সিডি ধরিয়ে দেয় রানার হাতে। “একবার শুনে দেখুন।” জয়ার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই বিল্টু ছোঁ মেরে তুলে নিল সিডিটা। আর সিডি প্লেয়ারে চালিয়ে দিল। সবাই শুনল সংগীতম গ্রূপের গানের সাথে রানার হুইসেল। সোৎসাহ করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল প্যান্ডেল।
“ধন্যবাদ শব্দটা খুব ছোট। তবু আপনাদের গ্রূপকে, সবিতা ম্যাডাম কে আমার অশেষ ধন্যবাদ জানাবেন। এই সিডিটা আমার জীবনের অন্যতম এসেট।” জয়াকে রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে এগোতে এগোতে বলল রানা। “ধন্যবাদ টা নিজেই দিয়ে দিন না। আপনাকে তো আসতেই হবে পরশু।” জয়া ভ্রূ নাচিয়ে বলে উঠল।
“পরশু? পরশু কি হবে?”
“সিডিটা রিলিজ হবে। আপনাকে আসতেই হবে। পারফর্ম করতে হবে।”
“আ-আমি। আমি স-স্টেজে দাঁড়িয়ে কিছু করতে পারবো না। ক্ষেপেছেন নাকি মসাই!”
“আসতে আপনাকে হবেই। আর আমি জানি আপনি আসবেন। সন্ধে ৬টা। নন্দন। আসি।” প্রায় আদেশ দিয়েই রিক্সা চেপে মিলিয়ে গেল জয়া। জোর খাটাল? হতেও পারে।
সিডি প্রকাশের দিন নন্দন চত্বরে ঘোরাফেরা করতে লাগল রানা। সিগারেটের পর সিগারেট। পরীক্ষাতেও হয়তো এতটা টেনশন হয়নি তার। এখনো সংগীতম গ্রূপ পৌঁছয়েনি। ওদের আসার আগেই রানা এসে হাজির। হঠাৎ পিঠে পরম মমত্বে ভরা স্পর্শ। পিছন ফিরে রানা দেখলো সবিতা দেবী দাঁড়িয়ে। হেসে বললেন, “আমি জানতাম আপনি আসবেন। আসুন পাঞ্জাবিটা পরে নিন।”
“পাঞ্জাবি?”
“আমাদের গ্রূপের ইউনিফর্ম।”
রানা দেখল সবিতা দেবীর হাতে একটি কলকা করা হলুদ পাঞ্জাবি। যেমন টা সবিতা দেবী পরে আছেন অবিকল একই রকম। মানুষটা যেন একদিনের পরিচয়েই রানার থেকেও রানাকে বেশি করে চিনে ফেলেছেন।
মঞ্চে ওঠার আগে পার্স খুলে একবার মায়ের ছবিটা দেখল রানা। চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বাবা তার অসামাজিক কাজ মেনে নিতে পারেননি তবু রানার জন্য জেগে থাকেন ভোর রাত পর্যন্ত। প্রায় বছর দুয়েক কথা হয়নি বাবার সাথে। রানা রোজই চেষ্টা করে বাবার সাথে কথা বলার কিন্তু বিকাশ বাবু রোজই ছেলে বাড়ি ফেরার পর ছেলেকে খাবার টেবিলে বসতে দেখেন, তারপর একটি কথারও উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরে চলে যান। রানা জানে বাবা আজও তার জন্য জেগে থাকবেন। চোখটা এবার ভিজে গেল। রানার স্মৃতির জাল ছিঁড়ল মঞ্চের আহবানে। “এখন স্টেজে আসছেন সংগীতম গ্রূপের কলাকুশলীরা এবং তাদের নবতম সদস্য রণদীপ চৌধুরী।” সঞ্চালকের আহবান শোনা গেল। “রণদীপ,রণদীপ” নামটা যেন বহুযুগ পর কানে এল। এই নামটা যে আছে তা তার মনেই ছিল না। মনে মনে হেসে ফেলল রানা। আর বসে থাকার সময় নেই এবার মঞ্চে উঠতে হবে। পর্দা ঠেলে মঞ্চে উঠল সংগীতম গ্রূপ। শুরু হলো সংগীত লহরী। গানে, সুরে, গল্পে জীবনের এক অভাবনীয় সন্ধ্যা উপহার পেল রানা। তার হুইসলে করতালিতে ভরে উঠল হল। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলতে লাগল রেওয়াজ ছাড়া এমন হুইসেল দেওয়া ভগবান প্রদত্ত ক্ষমতা। এরপর এল সিডি প্রকাশের সময়। প্রত্যেক কলাকুশলীর হাতে একটি করে সিডি। সিডিটির মোড়ক উন্মোচন করলেন এক বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী। তিনি রানার কাছে এসে তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। সব কিছুই যেন স্বপ্ন রানার কাছে। এসব কি আদৌ সত্যি। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে সে।
অনুষ্ঠানের পর সকলে সকলকে বিদায় জানানোর পালা । কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা রানাকে। ফোন করলেও ফোন তোলে না সে। নিরুপায় হয়ে সকলে ফিরে চলল নিজ বাসায়। জয়া বাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে রইল বাস স্ট্যান্ডে। তাকে চমকে দিয়ে উদ্ভিদের মতো তার পাশে এসে দাঁড়াল রানা। “একি কোথায় ছিলেন এতক্ষন? সবাই আপনাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান আর আপনি..” জয়ার কথা শেষ হল না আলো আঁধারিতে সে দেখল রানার চোখ লাল। “আপনি কাঁদছেন?” জোয়ার সুর নরম হয়ে এল। “আজকের দিনটা কোনোদিন ভুলবোনা আমি জয়া দেবী। আপনারা আমায় যা দিলেন তা ভোলার নয়। তার কণা মাত্রও আপনাদের ফেরত দিতে পারব না হয়তো। কিন্তু আজকের পর থেকে ঐ নরক কি আমায় ছাড়বে?” বলল রানা।
“আপনি ছাড়তে চাইলে নিশ্চই পারবেন । আমি- না মানে আমরা তো আছিই আপনার বন্ধু।” জয়ার শেষ ক’টা কথায় নির্ভরতা পেল রানা।
বাস থেকে নেমে দুজনেই দুজনের গন্তব্যের দিকে হাঁটা লাগল। বাড়ির গেট অবধি পৌঁছেই অবাক হওয়ার পালা রানার। কি শুনছে সে! হ্যাঁ ঠিক, সংগীতমের গান। ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকল সে। ইজি চেয়ারে বসে বাবা, আর সোফায় ভাগাভাগি করে বসে দাদা বৌদি। ভাইঝিটা লাফিয়ে কোলে উঠে স্নেহের চুম্বন এঁকে দিল কাকার গালে। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোথা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ছ্যাৎ করে উঠল রানার বুকটা। ওরা কি তবে অনুষ্ঠানে গেছিল? সিডি প্লেয়ারে বেজে চলেছে একের পর এক গান। রানা নিঃশব্দে বাবার কাছে গিয়ে কোলে মাথা রাখল। ফুঁপিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “হুইসেল করা খুব খারাপ নয় রে বাবা!”
সমাপ্ত--


Keya Chatterjee

 

0 Comments | 0 Claps
না, আর কেউ আসেনা, আসেনি এ পর্যন্ত। পদধুলি হয়তো সেই মলিনতা’র কৌলিন্য হারিয়েছে। পদধ্বনিতেও হয়তো সে পুরোনো মাধুর্য্য আর নেই। কস্তুরী হরিণে’র গায়ের গন্ধ যেন আজ দিশেহারা, উদ্দাম হাওয়াতে, বৃষ্টিতে লেগে আছে বিষাদের স্বেদবিন্দু। ভোরের আর বিকেলের আলোর মাঝখানে তোমার শরীরী অবয়ব টা নিয়ে সবশেষে আসে সর্বাঙ্গসুন্দর জ্যোৎস্না। আঁচল পেতে ব’সতে বলে, প্রজাপতি রঙে’র পশরা নিয়ে, ফড়িং চঞ্চলতা নিয়ে, আর পারিজাত বিভাজিকা’র কবোষ্ণতা নিয়ে অনেক রাত অবধি অনুনয় বিনয় ক’রতে থাকে বেদী’র প্রান্তে। সবশেষে আসে শীতল সমীরণ, দু’হাতে ওর বুকে জড়িয়ে ধরে। শিশির ঝ’রে পড়ে বুকে, মুখে, ঘুম এসে ধীর পায়ে নিয়ে যায় শেষে তোমার বুকে --- স্বপ্নে---নিশি অন্তে---একান্তে।


শ্রী সেনগুপ্ত

 

0 Comments | 0 Claps
স্নেহছায়া
--------------
শ্যামল কুমার রায়
প্রথম অধ্যায়
---------
ইছামতীর তীরে দাঁড়িয়ে, জীবন থেকে পালিয়ে আসা সমরেশ,পড়ন্ত বিকেলে রামধনু রঙা নীল আকাশের দিকে চেয়ে উদাস হয়ে ভাবছিল - তার জীবনটা একটা দারুণ গল্প হতে পারত ; যা হয়ত প্রকাশ ঝা এর ফিল্মের চেয়েও মশালাদার, আবার মহাভারতের চেয়েও বৈচিত্র্যময়। এক লপ্তে সমরেশ ফিরে গেল আজ থেকে আঠাশ বছর আগের জীবনে। তখন সমরেশ বছর দশকের। নিশ্চিন্তপুর গ্রামে ক্লাস ফোর এ পড়ে। জীবন কত নিষ্ঠুর তা দশ বছর বয়সে , পিতৃহারা হওয়া সমরেশ বেশ বুঝেছিল। পেশায় ছোট্ট একটা মুদিখানার মালিক ছিলেন সমরেশ এর বাবা,পৃথ্বীরাজবাবু । সেভাবে, জীবনে গুছিয়ে কিছু করে উঠতে পারেননি, পৃথ্বীরাজবাবু। বরঞ্চ, ঐ স্বল্প আয়ের মধ্যেই বিধবা বোন, বেকার ভায়ের ভরণপোষণ ও শয্যাশায়ী মায়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু, একটা হার্ট অ্যাটাক্ - সমরেশের আর ওর মায়ের জীবন তছনছ করে দিল। যারা এতদিন পৃথ্বীরাজবাবুর ছত্রছায়ায় সযত্নে লালিত হয়েছেন , তাঁরাই ভাগাভাগি শুরু করে দিলেন ।
গত বারো বছরের স্বামীর পাঁচ ভূতের সংসারে কলুর বলদের মতো শুধু খেটে মরেছে সমরেশের মা। আজ অন্য রূপ দেখে তাজ্জব বনে গেছেন । তবুও সেই অবস্থায় সমরেশ আর ওর মা, সদ্য বিধবা, শ্যামশ্রী পাইকার রক্ষা করেছে স্বামীর শেষ চিহ্ন ' তারা মা ভাণ্ডার ' কে। বেশ লড়াই করে ভাগ বাটোয়ারা এর সময় প্রতিষ্ঠিত করেছে নিজেদের অধিকার। এক হাতে দোকান আর এক হাতে ছেলে মানুষ করার গুরু দায়িত্ব সামলেছেন। অকাল বৈধব্যের জীবনে কোনো পর পুরুষের সঙ্গ কামনা করা তো দূরের কথা, মনের মধ্যেও ভাবনাটা আসেনি বছর একত্রিশ এর শ্যামশ্রীর। আজ এক সেলাই করা সংসারের মালকিন সে। শিকারী চোখের লোলুপ দৃষ্টির মানুষজনের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে যথেষ্ট শালীনতার সাথে হালকা কালারের শাড়ি পরে ও। তাও দোকানে মাল নিতে এসে কিছু খদ্দের এর চোখ যেন ওর গোটা শরীর মেপে দেখে। বড় অস্বস্তি লাগে, শ্যামশ্রীর। ছেলে, সমরেশের চোখের আড়ালে চোখের জল ফ্যালে ও।
টানাটানির সংসারে আশার আলো বলতে তো ঐ টুকাই। টুকাই - সমরেশের ডাক নাম। টুকাই যখন সিক্স এ পড়ে, তখন একদিন মাকে লুকিয়ে চোখের জল ফেলতে দেখে ভ্যা করে কেঁদে উঠেছিল সে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে নিষ্পাপ শিশু সেদিন বলে উঠেছিল, মা! যদি বড় হতে পারি, তাহলে আর আমাদের দুঃখ থাকবে না। ছেলের গালে হামি খেয়ে, বুকের জ্বালা বুকে লুকিয়ে শ্যামশ্রী বলে উঠল, তুই থাকতে দুঃখ কিসের সোনা? খুব সন্তর্পণে পা ফেলে এসে নিয়তি দূর থেকে হেসেছিল। আসলে, সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক মেগ্যালোমোনিয়াক ভাবী শাশুড়ির। বরাবরের মেধাবী সমরেশ স্কুল, কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ম্যাট টেস্ট দিয়ে কম খরচে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করছে। কিন্তু, চব্বিশ পরগনা জেলার নিশ্চিন্তপুর থেকে আসা সমরেশ পাইকার কখনও প্রেম করার সাহস দেখায়নি। অথচ ইউনিভর্সিটি প্রফেসর এর মেয়ে রাজলক্ষ্মী ভান্ডারী ওকে ক্যাম্পাসে ফুল দিয়েছিল। চরম বাস্তববাদী সমরেশ পাইকার মৃদু হেসে বলেছিল, চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে হয়, রাজলক্ষ্মী। একটা টিমটিমে মুদিখানার দোকান আর পৈতৃক একচালা দুটো ঘর - এই নিয়েই মা- ব্যাটার সংসার। তবে তুই ভালো বন্ধু হতে পারিস।
স্বভাব লাজুক মুখচোরা সমরেশের মুখে জীবন সম্পর্কে এত স্পষ্ট কথা শুনে পরীর মতো বেড়ে ওঠা রাজলক্ষ্মী একটু আঘাত তো পেয়েছিলই। যাইহোক, এম বি এ পাশ করে ইউরেকা ফোর্বস এ বেশ মোটা বেতনের চাকরি পায় সমরেশ। আস্তে আস্তে বাড়ির ভোল বদলাতে শুরু করে সমরেশদের। পাছে ধার চায়, এই ভয়ে সমরেশ ও তার মা শ্যামশ্রী কে আত্মীয়- স্বজন সবাই এড়িয়ে চলত। অথচ চাকরি পাওয়ার পর সমরেশ কে ডেকে নেমন্তন্ন করল বছর তেত্রিশ এর মিতু কাকিমা। কাকিমা আর ওনার বছর দশকের মেয়ে শর্বরী একাই থাকে নিশ্চিন্তপুরে। বছর সাতচল্লিশ এর সনাতন ঢালি মিতু কাকিমার স্বামী। ওদের সাথে সমরেশদের পারিবারিক সম্পর্ক বেশ ভালো। আসলে সনাতন কাকা প্রায় সারা বছরই বেসরকারি জাহাজে কাজের জন্য বাইরে থাকেন। বছরে বড় জোর পনেরো দিন করে মোট ত্রিশ দিন বাড়িতে আসেন। সনাতন কাকাই মিতু কাকিমা কে এই তারা মা ভাণ্ডার মুদিখানা নিতে বলে গেছিল।পরে ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে শ্যামশ্রী দোকানের দাওয়াতে কাঁচা আনাজের ও তেলেভাজার কারবার শুরু করেছিল। মিতু কাকিমা মেয়ের হাত ধরে এসে ওদের দোকান থেকে মালপত্র নিয়ে যেত। শর্বরীও দাদার কাছে গ্রীষ্মের ও পুজোর ছুটিতে পড়তে আসত। সব সম্পর্কই এখানে বানিজ্যিক ছিল না।
মিতু কাকিমা যেদিন সমরেশকে খেতে নেমন্তন্ন করেছিলেন, সেদিন সকালেই শ্যামশ্রী ওর বাপের বাড়ির পৈতৃক ভিটে ভায়েদের লিখে দেবার জন্য বাপের বাড়ি গেল। বহুবছর পর বলে ভাজেরা আটকে দিল। শুধু বলল , টুকাই এল না? তিন সন্ধ্যে বেলায় সমরেশ বাড়িতে চাবি দিয়ে মিতু কাকিমাদের বাড়ি চলে গেল। সমরেশের কাছে বরাবরের খোলামেলা মিতু কাকিমা।

স্নেহছায়া
দ্বিতীয় অধ্যায়
-----------------

বেশ মন খুলে কথা বলে, প্রয়োজনে বন্ধুর মতো পরামর্শ দেয়। সমরেশও সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে চাবি দিয়ে মিতু কাকিমাদের বাড়ি চলে গেল। ওদিকে শর্বরীও দাদার সাথে খেলা করতে লাগল। ওদিকে মিতু কাকিমা সন্ধ্যের টিফিনে লুচি ঘুগনি করল; ঠাট্টা করে বলল, তুই তো এখন বড়ো কোম্পানির বাবু; কাকিমার রান্না পছন্দ হবে কিনা কে জানে? শুনে সমরেশ একটা প্রাণ খোলা হাসি দিয়ে বলল, এই ক'দিন আগেও যাদের আজ খেতে কাল ছিল না, তাদের আবার নবাবী! শর্বরী কাকিমার কোলে অনেক পরেই এসেছে, সনাতন কাকা আসেও কম, আবার কাকিমার সাথে বয়সের ব্যবধানও যথেষ্ট। খেলতে খেলতে শর্বরী বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কাকিমা ঘুমন্ত মেয়েকে খাইয়ে শুইয়ে দিল। তোর খবর কি বল? কাউকে দেখে রেখেছিস? আমতা আমতা না করে স্পষ্ট করে বল। দরকারে,আমিই তোর মাকে বলব।না ইউনিভর্সিটিতে রাজলক্ষ্মী একবার প্রপোজ্ করেছিল;ওকে খুব স্পষ্ট করে 'না' বলে দিয়েছিলাম। টুকাই, তুই কি ওকে মনে মনে ভালোবাসিস? না, তবে ও আমার ভালো বন্ধু। সামনের মাসে ও ওর বরের সাথে কানাডা চলে যাচ্ছে। বেজায় গরম কিন্তু, কাকিমা। তা যা বলেছিস। পাশের ঘরে মেঝেতে বসে টুকাই আর তনু কাকিমা গল্পে মশগুল। আসলে, মুখ বুজে থাকতে থাকতে, তনুর ভেতরে অনেক কথা জমে ছিল। তনুর চেয়ে বছর আষ্টেকের ছোট হলেও বন্ধু হতে দোষ ছিল না। ঝুপ করে লোডশেডিং হলে, তনু বলে উঠল, টুকাই, তুই হাত পাখা নিয়ে বস; আমি একটু কলতলায় গা ধুয়ে আসি। বেশ। অন্ধকারের মধ্যেই তনু সাবান মেখে চান করে নিল। হঠাৎই, কারেন্ট এসে যেতে টুকাই এর চোখে যেন ঘোর লেগে গেল। তনুর শরীরী আকর্ষণের তীব্রতা থেকে চোখ ফেরানো কঠিন ছিল। টুকাই এর মধ্যে যেন হঠাৎই একটা বয়সোচিত পৌরষ জেগে উঠল, যা ন্যায় নীতি সংস্কার মানতে অস্বীকার করছিল। ওদিকে স্বামী সোহাগ থেকে বঞ্চিত তনুও নিমরাজি ছিল না। কখন যে চার হাত এক হয়ে গেল, তা ওরাও ঠিক বলতে পারবে না। নিজেকে সমর্পণ করে তনু বলে উঠল, তোর সনাতন কাকা, বিভিন্ন ডকে নারীসঙ্গ করে। শর্বরীর জন্যও ওর আর মন কাঁদে না রে , তনু।
তবে তোর সঙ্গসুখ আমি উপভোগ করলাম, তুই পুরুষ। এই সম্পর্ক কিন্তু তোর বৈবাহিক জীবনে কোনো বাধা হবে না। তুই আমায় লোকচোখে কাকিমা হিসেবেই পাশে পাবি। আর আড়ালে? , টুকাই জিজ্ঞেস করলে, তনু গালে চুমু খেয়ে বলল, জানি না যা। আসলে নির্জনে ঘর কাঁপল, খাট কাঁপল, দেওয়াল ঘড়ি থমকে দাঁড়িয়ে লিখে নিল সব। জনবিরল নিশ্চিন্তপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে সনাতন কাকার বাড়ি থেকে সকালে শর্বরীকে পড়িয়ে টিফিন খেয়ে টুকাই বাড়ি চলে এল। নিজের কাকা , কাকিমা, বিধবা পিসির সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকায় , কেউ ওর গতিবিধির খবরও পেল না। ইছামতী দিয়ে অনেক জলই গড়াল। মোটা বেতনের চাকুরে দেখে অনেকেই মেয়ে দিতে চাইল। শ্যামশ্রী পাইকারকে তখন পায় কে। দীর্ঘদিনর অবহেলিত , পদদলিত , সমাজের কাছে উপেক্ষিত শ্যামশ্রী পাইকার আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, নিজের শ্রম, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও টুকাই এর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
কিন্তু, এর অর্থ কি এই, ওদের কথাতেই বাতাস বইবে, পাতা নড়বে? তাই কি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে, সমরেশের বিয়ে পর্যন্ত।মিতু কাকিমার সাথে ঘটা ঘটনাটা নেহাতই তপ্ত মরুভূমিতে কাঙ্খিত মুষলধারে বৃষ্টির মতো। তার ন্যায়,নীতি, মূল্যবোধের পর্যালোচনা সমাজের তথাকথিত মূল্যবোধের ঠিকাদারদের উপরই থাক। মা অন্ত প্রাণ, টুকাই শুধু একটাই কথা বলল, মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ ; আমার আলাদা করে কোনও পছন্দ অপছন্দ নেই। যারপরনাই খুশি হল শ্যামশ্রী পাইকার, ছেলের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেখে। অনেক দেখেশুনে নিশ্চিন্তপুর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ঋজুদহ গ্রামের ধীরাজ সামন্তের মেয়ে মল্লিকা সামন্তকে বৌমা নির্বাচন করল শ্যামশ্রী পাইকার। মল্লিকা সেই বছরই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণা মল্লিকাকে দেখে পাড়ার ডক্টরেট শাশুড়িরা যেচে পরামর্শ দিল, অল্প বয়সী মেয়ে বৌমা পেয়েছো, নিজের মতো করে গড়েপিঠে নিও। জীবন যুদ্ধে ভালো মতন পুড়ে পোক্ত হওয়া শ্যামশ্রী অনেক ভেবেচিন্তে ঘটি বাড়িতে ছেলের বিয়ে দিল। একে ঘটি, তার উপর আবার উগ্র ক্ষত্রিয়। আসলে ধীরাজ সামন্তের রেশনের ডিলারশিপ, পয়সার অইগই নেই। কিছু না চাইতেই সমরেশদের সদ্য বানানো দোতলা বাড়ি পুরো সাজিয়ে দিল। বেমানান বলতে শুধু রয়ে গেল ঈশ্বর পৃথ্বীরাজ পাইকার প্রতিষ্ঠিত 'তারা মা ভাণ্ডার'; শ্যামশ্রীর দীর্ঘ ষোলো বছরের সংসার সংগ্রামের এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
আর মল্লিকা? ওর দু'চোখে শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন; স্বামী সোহাগের স্বপ্ন, উদ্দাম প্রেমের স্বপ্ন; নতুন সংসারের স্বপ্ন; পড়াশোনা থেকে মুক্তির স্বপ্ন। মল্লিকা আসলে ধীরাজ সামন্তের আদরের বাগানে স্নেহের প্রজাপতি। বাপের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন কত বলেছে , মল্লিকা আমাদের রাজনন্দিনী; ছোট নির্ঝঞ্ঝাট সংসার; স্বামী সকালে অফিস বেরিয়ে যায়; শাশুড়ির আর বৌমার তখন সারাদিন রাজত্ব।

Shyamal Kumar Roy

 

0 Comments | 0 Claps

ট্রেনে উঠেই মামা ফিক করে হেসে বলল , “ যাক আমি তাহলে এখনও যুবক বল ।“
দিল্লিগামী যুবা এক্সপ্রেস তখন বেশী গতি নিয়েছে । মামার কাঁধে মাথা রেখে টুটুন পরম নিশ্চিন্তে হালকা ঝিমুনি দিচ্ছে । হঠাৎ করে ভার্গভ আঙ্কেলের জরুরী তলব পেয়ে ভরা গ্রীষ্মে টুটুনকে বগলদাবা করে এই যাত্রা ।
ভারতের রেল লেট করবে না তা কি হয় ! করছেও তাই । পাক্কা ১২ ঘন্টা ঠায় বসে থাকা ।সকালের আলোয় কালো কাঁচে ঘেরা জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখে ক্লান্তির ঘুম নেমে আসে । পাশ দিয়ে দৌড়ে চলে যায় নদী-প্রান্তর , ধুসর জমি ।
মাড়ওয়ার রাজপ্রাসাদের বারান্দায় মহারাজ হনুওয়ান্ত সিংহ খানিকটা চিন্তিত হয়ে পায়চারী করছেন । ঠিক সেই সময়ে মালি একগোছা রক্ত গোলাপ নিয়ে রাজার সামনেই আসতেই ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে বললেন , “ কি চাস তোরা ! জানি না সে আসবে কিনা ফিরে ... বড়ই ভালবাসত রক্ত গোলাপ । নিজের হাতে পুঁতে ছিল এর চারা । অথচ কী পরিহাস , ফুল ফুটেছে কিন্তু সে আর নেই ।“ খানিকটা থেমে আরো তীব্র স্বরে চীৎকার করলেন ,” যা যা বেরো আমার সামনের থেকে । কেন আনিস তার স্মৃতি বার বার ...।“
মালি কিছু বলতেই রাজা বুক পকেট থেকে একটা ছোট্ট কলম বার করলেন । প্রাচীন ভৃত্য এই কলমের অর্থ জানে । অস্ফুট গলায় “ নাহ রাজা নাহ “ বলে পিছন ফিরতেই পাশে থাকা কাঁচের ফুলদানীতে ধাক্কা লেগে সুউচ্চ মহল কাঁপিয়ে ঝনঝন করে তা ভেঙে পড়ল ।
টুটুন চমকে উঠে পরে । ট্রেন সজোরে ব্রেক কষেছে গাজিয়াবাদ ষ্টেশনে । মামা সিটের সামনের দিকে কিছুটা হুমড়ি খেয়ে পরেছে । ভাগ্নের দিকে তাকিয়ে মামা বলল , “ কে যে আনখাই চেন টানলো কে জানে ! এই নিয়ে তিনবার তিনবার !” টুটুনের চোখে বিস্ময় । কতক্ষণ ঘুমিয়েছে কে জানে সে । তবে জেগে ওঠার পরেও স্বপ্নটা জ্বলজ্বলে ।

প্রায় দুটো নাগাদ ট্রেন আসলো আনন্দ বিহারে । ভার্গবজী গাড়ী নিয়ে অপেক্ষাই করছিলেন । কাছাকাছি অঞ্চলেই তিনি থাকেন পরিবার নিয়ে । সংসদে ভালোই যাতায়াত । গাড়ী চালাতে চালাতে বললেন মামাকে , “ স্যার হোটেলে গিয়ে একটু ফ্রেস হয়েই আমরা কিন্তু বেরোব । আজ আর আগামীকাল সোমবার সংগ্রহশালা বন্ধ থাকে ...আপনাকে এই দু’দিনেই কিছু একটা করতে হবে ।“
মামা এবার মুখ খুললেন , “ একটু খাওয়ার জন্য সময় দিতেই হবে । বেচারা এমনিতেই অসুস্থ । আমার কথাতে ওর মা ছেড়েছে ।“ ভার্গব খুব একটা অরাজী হলেন না । সুবিশাল রাস্তা দিয়ে গাড়ী সাই সাই করে ছুটে চলেছে ।

যতই তাড়া দিক স্নান পর্ব শেষ করে কোনমতে দুটো মুখে দিয়ে ছুটতে প্রায় বিকালের ঘরে কাঁটা ছুঁই ছুঁই । টুটুনের শরীর এখনো দুর্বল । মামা যতই ভবঘুরে হোক না কেন , ভাগ্নের বিষয়ে বেশ সচেতন । জিন্স পরতে পরতেই মামা ওর মুখে ট্যাবলেট গুঁজে দেয় । গ্লাসে চুমুক দিয়ে এক নিঃশ্বাসে জল শেষ করে হাত দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে টুটুন মামার দিকে তাকিয়ে বলে , “ আচ্ছা , মাড়ওয়ারের রাজা কলমটা কত সালে মাউন্টব্যাটনকে দিয়েছিলেন ?”
মামা পাঞ্জাবীর বোতাম ঠিক করতে করতে বলে , “ আবার সেই স্বপ্নটা বুঝি !” কথাটা শুনে হালকা হেসে টুটুন ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে । মামা যদিও এরপর বিশেষ কিছু বলে নি , তবে আগের থেকে একটু চুপচাপ হয়ে যায় । বারবার বিছানায় এলিয়ে পরা দেখে টুটুন বুঝতে পারে মামার মনে কোন একটা বিষয়ে ক্রিয়াকর্ম শুরু হয়ে গেছে । ড্রয়িং রুমে এসে দেখলো ভার্গবজী নেই , বাইরে তার গাড়ী হর্ন দিচ্ছে ।
বিকাল ৫টা নাগাদ সংসদ মার্গ অতিক্রম করে পার্লামেনেন্টের সামনে গাড়ী এসে পৌঁছায় । চেকিং পর্ব মিটিয়ে ভার্গবজী নিয়ে যান ভেতরে । ছবি তোলা বারণ । এতবড় প্রাসাদ ! অসম্ভব সুন্দর এর সৌন্দর্য । লাল শক্ত পাথর দিয়ে গাঁথা ভবনগুলি । টুটুন যেতে যেতে থমকে যাচ্ছে এই অসাধারণ স্থাপত্য দেখে । সময় কম । মামা কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গিয়ে অনুচ্চ স্বরে “ টুটুন “ বলে হাঁক পারে । দৌড়ে কাছে যেতেই মামা সস্নেহে পিঠে হাত রেখে বলে , “ বলব রে বলব এই প্রাসাদের গপ্প । “
খানিকটা এগোতেই ভার্গবজী বলেন , “ আইয়ে স্যার ।“ সামনেই পেল্লাই কাঁচের দরজা । এত বড় পার্লামেন্ট অথচ বাইরে প্রবল গরম থাকা সত্ত্বেও ভিতরে ঠাণ্ডা হাওয়া , মনে হচ্ছে সারা ভবন জুড়েই এসি । আঙ্কেলের পিছন পিছন হেঁটে মামা আর টুটুন হাজির হল জাতীয় সংগ্রহশালায় । লোক নেই বললেই চলে । এখানে দেখার বলতে স্বাধীনতা সংগ্রামের বেশ কিছু ইতিহাস নামা আর মুর্তি । টুটুন ভেবে পেল না এখানে আসার অর্থটাই বা কী ! মামাকে ফিসফিস করে কথাটা বলতেই মামা হাত নেড়ে চুপ করতে বলল।
একটু এগোতেই ভার্গবজী বললেন , “ দেখিয়ে স্যার , আপনারা ভাবছেন এখানে কেন আনলাম , তাই না ?” খানিকক্ষণ মামা চুপ থেকে উত্তর দিল , “ ভার্গবজী এনেছেন যখন এতদূর থেকে টেনে তখন কারণ তো আছেই , বিশেষ করে মহারাজ হনুওয়ান্ত সিংএর কথা আসার আগে আপনি বলেইছেন ।“
ভার্গবজী আর থাকতে না পেরে অতবড় পদস্থ মানুষটি মামাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে কাঁচুমাচু মুখে বেশ জোর গলায় বললেন , “ স্যার , যে কলমটার কথা আপনাকে বলেছিলাম তা বহুকষ্টে ব্রিটিশ সরকার প্রথমবার এইখানে জনসাধারণের সামনে আনতে চেয়েছিল …।
মামা ভ্রূ কুঁচকে থাকলো ভার্গবের কথায় । হয়তো নীরবেই অনুমান করার চেষ্টা করছে । ভার্গবজী পুনরায় গলা ঝেড়ে বলতে থাকলেন , “ সেই অনুসারে আনাও হয়েছিল দিন দশেক আগে কিন্তু পাবলিকলি জানানোই হয় নি কার কলম ।“
টুটুন প্রথম মুখ খোলে , “ আচ্ছা আঙ্কেল , কলমটা তার মানে খুবই সাধারণ ভাবে এই কারনেই রাখা হয় যাতে সকলের দৃষ্টি পরলেও খুব একটা আমল দেবে না , এটাই উদ্দেশ্য তাই কী ?”
“ রাইট মাই বয় । আসলে এটা শুধু কলমই যে নয় তা তোমার মামাকে বলেছি । আর তার থেকেও বড় বিষয় হল যে এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে আবেগ ও রাজ পরিবারের বেশ কিছু অজানা-গোপন ইতিহাস ।“ একনাগাড়ে কথাটা শেষ করে অদূরে রাখা সাদা সোফায় মাথা নীচু করে বসে পরলেন ভার্গব ।
মামা কাঁচের শূন্য বক্সটি মন দিয়ে দেখতে দেখতে টুটুনকে কাছে ডেকে প্রশ্ন করল , “ বলত এই বিশাল বিল্ডিং কী পাথর দিয়ে তৈরী ?” আকস্মিক এই প্রশ্নে টুটুন তো অবাক । প্রশ্নটা শুনে ভার্গবও অবাক !
টুটুন ঠোঁট উল্টিয়ে বলল , “ মনে হয় করমন্ডল মার্বেল , তাই কী ?”
ভার্গবজী উঠে বললেন , “ আমি বলি , করমন্ডল মার্বেল দিয়ে সিঁড়ি তৈরী হয় কিন্তু ...কিন্তু , আপনিই বলুন ।“
“ দক্ষিণ নিজিল্যন্ডের তাক্‌আকা মার্বেল যা ওই পাহাড়ে পাওয়া যায় আর এটা কাইরুরু কোয়াইরি অঞ্চলে অবস্থিত । সিঁড়ি করমন্ডল মার্বেল দিয়ে বানালেও ভবনটির জন্য এডউইন লুইটিয়েন এবং হারবার্ট …।”
মামার কথা চলতে চলতে একজন সুপুরুষ ভদ্রলোক প্রবেশ করেন । মামা কথা থামিয়ে ওনার দিকে তাকাতেই ভার্গব পরিচয় করিয়ে দিলেন , “ স্যার ইনি হচ্ছেন সুন্দর সিং , এনার পরিচয় আপনাদের পরে দেব ।“
ভদ্রলোক বেশ লম্বা , গায়ের রঙ টকটকে ফর্সা । টুটুনের সাথে সাথে মামাও হাত মেলালো ঠিকই কিন্তু অদ্ভুত চাহনি মামার চোখে ।
পশ্চিম দেশে সূর্য দেরীতে যে অস্ত যায় তা বোঝা গেল বাইরে বেরোতেই । সন্ধ্যে সাতটা অথচ আকাশে তখনও গোধূলির উজ্জ্বল লালিমা । রাষ্ট্রপতি ভবনের গা ঠিকরে হালকা বেগুনী আলোর ছটা । মামা নিজেই নিষেধ করে দিলেন ভার্গবকে পৌঁছে দিতে । মামা নতুন স্মার্ট ফোনে উবের বুক করে দিল্লীর রাজপথে হোটেলের জন্য বেরিয়ে পড়ল ।

বিগত একদিন বিছানায় গা এলাতে পারে নি কেউই । কোনমতে মুখে কিছু গুঁজে টুটুন বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল ।
সামনেই এবড়োখেবড়ো রুক্ষ পাহাড় । ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা ঘিরে ধরছে । সূর্যের আলো এখন উড়োজাহাজের গায়ে ম্লান হয়ে পড়েছে । দুই দম্পতির চোখ অদূরের পাহাড়ের কোল ঘেঁষা পাথরের আড়ালে গজিয়ে ওঠা গাছের গাঢ় ছায়া দেখে আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে । উড়োজাহাজ নিজেদের , তাই যাত্রী বলতে ওরাই । রাজকীয় পোশাকে নারী বায়না ধরে , “ ওই...ওইখানে নামবো চল...।” আবদার বরাবর রাখতে ভালবাসেন রাজপুরুষ । আস্তে আস্তে পাক খেতে খেতে নামতে থাকে । ক্রমে ক্ষুদ্র বনানীর মাঝে নরম ঘাসের আস্তরণ দেখা দিতে থাকে । চাকা মাটি স্পর্শ করছে । আর ঠিক তখনই বিকট বিস্ফোরণ আর আগুনের মাঝে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় সমগ্র বনাঞ্চল ।
চীৎকার , এক কাতর চীৎকারে টুটুন ধপ করে বিছানা থেকে পরেই ঘুম চোখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে । রুমের আলো অনেকটাই ম্লান । টুটুন তাকিয়ে দেখে মামা নেই । ভয়ঙ্কর স্বপ্নে টুটুনের গলা শুকিয়ে উঠেছে । কিন্তু মামা কোথায় গেল ! কার্পেট থেকে উঠে টেবিল ল্যাম্পের দিকে এগোতেই মোবাইলের দিকে চোখ যায় ।মোবাইল উঠিয়ে খেয়াল করে মামার তিনটে মিস কল । ফোন সাইলেন্ট ছিল, তাই মামার ফোন ধরতে পারে নি ।
যদিও মামার এ ধরনের ব্যবহার নতুন নয় কিন্তু এবারে ওকে যে কেন নিল না , সেটা ভাবতেই টুটুনের বাকী রাতের ঘুম গেল । আর একী ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন ! টুটুন নিজেও জানে না এর কারণটাই বা কী ! শারীরিক দুর্বলতা , না , মামার বলা রাজ পরিবারের ইতিহাসের অনুররণ !
কথাগুলো মামায় ঘুরপাক খাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে মোবাইলটা কেঁপে উঠলো । বার কয়েক ভাইব্রেট হতেই টুটুন হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা নম্বর । তবে কী মামার কিছু হল ! অনুমান খুব একটা মিথ্যা হল না , কারণ রিসিভ করতেই একটা ধাতব অথচ ভাঙা হিন্দিতে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসলো , “ আপকা মামা খতরে মে , গেট লস্ট ফ্রম ইন্দ্রপ্রস্থ ...।“ টুটুন হ্যালো হ্যালো বলল ঠিকই কিন্তু সেই স্বর ততক্ষণে লাইন কেটে দিয়েছে ।
মামা বিপদে ! কাকেই বা জানাবে এই রাতবিরেতে ? ভার্গব আঙ্কেল ? কিন্তু মামার কাছ থেকে আঙ্কেলের যোগাযোগের কোন নম্বরই নেওয়া হয় নি !
ঘড়িতে তখন রাত তিনটের কাঁটা ছুঁইছুঁই । মনের ভিতরে তোলপাড় করছে কিন্তু দরজায় কলিং বেলের আওয়াজে টুটুন চমকে উঠলো । রুমের বড় লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলতেই অবাক !
_ “ স্যার আপকে লিয়ে কোই সামান ছোড়কে গিয়া ওর বলে আপ কো দেনে কে লিয়ে “ রুম সার্ভিস ছেলেটার দিকে টুটুন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো । ছেলেটি পুনরায় ডাকতেই সম্বিৎ ফিরে পায় । ছোট্ট একটা প্যাকেট । দরজা বন্ধ করে আলোর সামনে প্যাকেটটি খুলতেই টুটুনের ভ্রূ আরও কুঁচকে উঠলো । একী ! এটা কী ? ছুঁচলো একটা ডট পেনের ইঞ্চি তিনেকের মুখ যার সাথে একটা চিঠি । মাথামুন্ডু কিছুই ঢুকছে না । তাতে ইংরাজি হরফে বাংলাতে লেখা ছড়া । টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়তে লাগলো টুটুন ...
“ লিপি নয় নাশে প্রাণ
সূর্যের নগর দিল সম্মান ।
সুন্দরা বংশ নেয় প্রতিশোধ ,
রাজায় রাজায় করে বিরোধ ।
ইন্দ্রের রাজ্যে ঘুমায় পাথরের বুকে ,
লক্ষ পাথর বুকে , জল জমেছে চোখে ।
রবি চেয়ে থাকে পাষাণ বইয়ের দিকে ।।“
কাগজটা পাশে রেখে মোবাইলের দিকে হাত বাড়ায় টুটুন এবার । মামাকে ফোন করে দেখা যাক ৮৬১৭… ।পুরো ডায়াল না করতেই মামার নম্বর থেকে ফোন আসে । কাল বিলম্ব না করেই টুটুন রিসিভ করে ।
“ কী ব্যাপার কোথায় তুমি ? কী …কখন ! না না আমি রুমেই আছে । হুম …। পেলাম কিন্তু তুমি জানলে…।“ মামার গলা থেমে যায় । শরীরে যেন হাজারটা ক্লান্তি । মামার কথায় খানিক ভরসা পেয়ে লেখাটা পড়তে থাকে ।
ছড়াটা জটিল নয় খুব একটা কারণ এর থেকেও জটিল ধাঁধাঁ আগেও পেয়েছে । কিন্তু সমস্যা বাধাচ্ছে দ্বিতীয় আর তৃতীয় লাইন ! কে কাকে কেনই বা প্রতিশোধ নিতে চায় ? এই অভিযানের মূল সমস্যা কী মামা তেমন ভাবে কিছুই জানায় নি । একটু তলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেই মামা বলে এসেছে , “ তোর শরীর ঠিক নেই মাথায় অযথা চাপ নিস না “। টুটুন বিরক্ত হলেই আবার বলে , “ দ্যাখ টুটুন বেশী জেনে কিছু লাভ নেই , ভারত সরকারের তেমন ভূমিকা না থাকলেও রাজা-মহারাজের এক গোপন কথা জমে আছে ৭০ বছরের বেশী সময় ধরে । “
“ কাদের কথা মামা ?” জানতে চেয়েছিল । মামা কথা ঘুরিয়ে যোধপুরের গল্প শুনিয়েছিল সারাটা রাস্তায় । একের পর এক ভাবতে ভাবতে টুটুনের চোখ কখন যে বন্ধ হয়ে যায় তা ও নিজেও জানে না । ডোরবেলের শব্দে ঘুম ভাঙে । আলস্য শরীরে হাই তুলতে তুলতে দরজা খুলতেই ভার্গব আঙ্কেল আর সেই লোকটা সুন্দর সিং । কিন্তু মামা কোথায় ? প্রশ্নসূচক চোখে তাকিয়ে থাকে টুটুন ভার্গবের দিকে ।

ভোরের দিল্লী । লম্বাটে গাড়ী ছুটে চলেছে । গতকালকের রাস্তার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া মুশকিল । যমুনা ব্যাঙ্কের কাছ দিয়ে গাড়ীটা পার হতেই পাশে বসে থাকা ভার্গবজীকে প্রশ্ন করলো , “ কোথায় যাচ্ছি আমরা ? মামার কোন খবর পেলেন ?”
ভার্গব চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে বললেন ,” মামার খবর ! ও হ্যাঁ ভালোই আছেন , রাজ যত্ন পাচ্ছেন ।“
অদ্ভুত গলার শব্দ । টুটুনের চোখে কেবল বিস্ময় । তারমানে ভার্গব আঙ্কেল জানে মামা কোথায় । অথচ ... ধৈর্য রাখতে না পেরে আবার জিজ্ঞাসা করল , “ আপনি জানেন , আমাকে কিছু না জানিয়ে ...।”
“ আরে ভাই ইতনা বকবক কাহে করতে হো “ , ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে সুন্দর সিং বলে উঠলেন ।
এ কেমন কথা । ভার্গব আঙ্কেল গতকাল অত মিষ্টি ব্যবহার করার পর আহ এদের দুজনের হলটা কী ? টুটুন থম মেরে জানলার একপাশে বসে ভাবতে লাগলো । কাগজের কথাটা বলবে কিনা বুঝতে পারছে না । বলবে কী বলবে না ভাবতেই গাড়ী একটা ট্র্যাফিক সিগনালের কাছে এসে ব্রেক কষল । সুন্দর সিং ভার্গবের দিকে চোখের ইশারায় কথা বলে নেমে পড়ল নীচে । অদূরে লেখা মান্ডি মেট্রো ষ্টেশন । সবুজ হতেই গাড়ী আবার এগিয়ে চলল । সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপার ভার্গব আঙ্কেল এই গরমেও প্রায় কপাল ঢাকা হ্যাট পড়েছেন । চোখে কালো সানগ্লাস ।
কালকের মিশুকে লোকটি রাতারাতি কী এমন ঘটলো যে এমন ব্যবহার করছেন ! কথা না বলার মত , কেবল হুঁ হ্যাঁ করেই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন ।
ভদ্রলোক বাঁ দিকের জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখছেন আর মাঝে মধ্যে কাকে ম্যসেজ দিয়েই চলেছেন ।
“ আঙ্কেল আমরা যাচ্ছি কোথায় ?” কথাটা পেরেই ফেলল টুটুন আর ঠিক তখনই খেয়াল করল গোঁফের নীচে কী যেন ঝকঝক করে উঠলো । গতকাল তো ... টুটুনের ভাবনায় ছেদ পড়ল ।
“ উতরো , চলে এসেছি “ ভার্গবের চাপা কথায় বাধ্য ছেলের মত নেমে পরলো টুটুন । কিছুটা এগিয়েই ডানদিকে ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং । লিফটে টুটুন আর বেজার গম্ভীর মুখে ভার্গব । ৯ তলায় উঠে লিফট নিজের থেকে থেমে গেল । ভার্গবজী প্রায় ঠেলতে ঠেলতে টুটুনকে একটা দরজার নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন । কলিং বেল বাজানোর প্রায় মিনিট দুয়েক পর নেপালী গোছের মোটাসোটা লোক দরজা খুলে দিল । ড্রয়িংরুমে পেল্লাই সোফায় ধপ করে বসে পরলেন ভার্গবজী ।
_ “ হরিয়া ,তেও পুরানা চাচা লে আও “ ভার্গবের চিবিয়েচিবিয়ে কথা শুনেই লোকটা টাক মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে ভিতরে চলে গেল । টুটুনের অনুমান খানিকটা মিলছে । এ কালকের ভার্গব নন । কারণ শুধুমাত্র নেপালী ভাষায় কথা নয় , তাছাড়াও গোঁফ...
ভাবনায় ছেদ পরলো , যখন টুটুন দেখলো হরিয়ার পিছন পিছন মামা ঢুকছে । এরকম অবস্থা আগেও ঘটেছে । মামা বরং এমন সময়ে স্বভাব মত ঠাণ্ডা থাকে , আজও তার অন্যথা হয় নি । টুটুনকে দেখে আলহাদের সুরে বলে উঠলো , “ আরে তুই এসেছিস , এরা কোন খারাপ ব্যবহার করে নি তো ? আমার জন্য দেখ দেখি কী কান্ড !” একটু থেমে ভার্গবের দিকে তাকিয়ে বলল , “ তা ভার্গব এত কাণ্ড করে আমাদের আনার দরকারটা বা কী ছিল বলতো । লর্ড মাউন্টব্যাটনের কলম তুমি যখন জানোই এখানে আছে তখন নিয়ে নিতে পারতে , তাই না !”
মামার কথা শুনে ভার্গব একটা তেরছা হাসি হেসে বললেন , “ আরে মামাজী আপনি পথ বাতলে না দিলে পেতাম কেমন করে বলুন ! যাইহোক নাউ ইউ সে হোয়ের ইস দেট পেন ?”
মামা সংযত গলায় উত্তর দিল , “ হায় কপাল আমি দেখলামই না , বলতে পারবো কী করে ?”
দাঁত কড়মড় করে পাশে রাখা টেবিলে একটা চাপড় মেরে বললেন , “ জাস্ট শাট আপ ! ইউ মাস্ট সে , বলতেই হবে ।“ পাশেই দাঁড়িয়েছিল টুটুন । একটু এগোতেই হরিয়া ওর হাত দুটো শক্ত করে ধরে থাকে । টুটুন বুঝলো বৃথা আস্ফালন , লোকটার গায়ে বাইসনের মত শক্তি ।
মামা যে কতটা জেদী সেটা অন্যরা না জানলেও টুটুন তার মামাকে ভালো করেই জানে । সুতরাং ভার্গব যতবারই কলমের দাবী করে যাচ্ছে ততই মামা শান্ত । এটা ঠিক রাগের মাথায় সকলে ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না । আর ঠিক তখনই হল বিপত্তি । ভার্গব রাগের মাথায় মামার জামার কলার চেপে ধরতেই টুটুন হরিয়ার দু’পায়ের ফাঁকে সজোরে কিক করলো । হরিয়া ততক্ষণে টুটুনের হাত দুটো ছেড়ে “ বাপ্‌স “ বলে নীচে বসে পরলো ।
দরজা যে হরিয়া বন্ধ করতে ভুলে গেছে তা কারোরই খেয়াল নেই । সেই ফাঁকে সুন্দর সিং ঘরে ঢোকে । সাথে আরেকজন ক্লিন সেভড্‌ ভদ্রলোক । আরে একী ! টুটুনের চোখে তখন বিস্ময়ের ঘোর ।
অবাক গলায় বলে উঠলো , “ ভার্গব আঙ্কেল আপ !” মামার মুখে হাসি । নকল ভার্গব পকেট থেকে ছুরি বার করতেই অদ্ভুত ভাবে ছুটে এলো লম্বাটে বুলেট । অব্যর্থ লক্ষ্য । সপাটে লাগলো নকল ভার্গবের ডান হাতের কব্জিতে ।

এখন বিকাল ৫টা । সব কাজ মিটতে বেশ হয়ে গেলেও টুটুনের আজ কোন ক্লান্তি লাগছে না । ব্যাপারটা যে এত দ্রুত শুরু হয়ে যাবে তা ওর কল্পনার বাইরে । মামাকে জিজ্ঞেস করতেই মামা হাহা করে হেসে বলল , “ রোসো বৎস । তোর মত ভার্গবও বেশ ঘেঁটে গেছে । তবে হ্যাঁ এই অভিযানে তোরা সকলেই অজান্তে সাহায্য করেছিস ।“ দরজায় বেল বাজতেই টুটুন উঠে গেল , সেই রুম বয় । হাতে চায়ের সেট । মামা ওকে ডেকে বলল , “ মিঃ সিং আর ভার্গব আসলে তুমি মানে আপনিও চলে আসবেন কিন্তু ।“ ছেলেটিকে মামা ‘ আপনি ‘ সম্বোধন করায় টুটুনের দুই ভ্রূ কপালে ওঠার জোগাড় ।
সমস্ত কাজ সেরে মিঃ সিং আর ভার্গব এলেন প্রায় সাতটা নাগাদ । চা ও স্ন্যাক্স খেতে খেতে ভার্গব বলে উঠলেন , “ মস্ত বড় বিপদ থেকে বাঁচালেন দাদা , দাদা বললে অসুবিধা নেই তো স্যার ?” শেষের প্রশ্নে মামা হাত নেড়ে জানালো , “ দাদা বললে বেশ নিজের মনে হয় । তা যাক বেচারা টুটুন অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছে ...”
মামার কথায় টুটুন বলে উঠলো , “ তা হব না কেন ? কালকেই আসলাম আর আজকেই খতম !”
সুন্দর সিং কাপ হাতে ধরেই বললেন “ মামা সাব আব বাতাইয়ে ।“
দুই হাতের তালু ভালো করে ঘষে মামা ঘরে পায়চারী করতে করতে বলল , “ যতদূর ইতিহাস বলে ১৯৪৮ সালে মাড়ওয়ার রাজা হনুওয়ান্ত সিং ভারতের সেসভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটনকে একটি বিশেষ কলম দেন । কলমটার যে সে কলম নয় , ওটা আসলে কলমের আড়ালে পিস্তল । যার লেখার দিকটা হল বুলেট ,আততায়ীকে ঘায়েল করার জন্য কলমের গায়ে লাগানো ছোট্ট নব টিপলেই বুলেট অনায়াসে লক্ষ্যভেদ করতে পারে ...”
“ আজ সকালে যেমনটা হল মামা ?” টুটুন হাতে তালি দিয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল ।
“ একদম ঠিক বলেছিস তুই “ মামা টুটুনের কাঁধে হাত রেখে বলল ।
“ ইস এত বড় ঐতিহাসিক জিনিষ আমার কাছে ছিল গত রাতে আর আমি কেমন হাঁদা তা ধরতেই পারলাম না !” টুটুনের গলায় কিছুটা বিষণ্ণতা ।
“ এখানেই মস্ত ভুল করছিস , ওটা আসল নয় । কী ঠিক বলছি তো ভার্গব ?” কথাটা শেষ করেই বাকী প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল ভার্গবজীর দিকে ।
ভার্গব আমতা আমতা করে বললেন , “ ঠিক বলেছেন দাদা । কলমটা রেয়ার আর ইউনিক । ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট থেকে কলমটা ভারতে আসার আগে তারা একটা রেপ্লিকা পাঠায় আমারই পরামর্শে । এটা যদিও বিদেশ আর স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পরামর্শ বা আদেশ বলতে পারেন , সুরক্ষা আর সম্মানের ব্যাপার তো ।“
ঘরের অপর প্রান্তে বসে ছিলেন সেই রুম বয় । ভার্গবজী জানালেন , “ ও হল ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টের , রাজেশ দাহেল । খাসা মাথা ওর ।“
মামা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি প্রকাশ করল । মামা খানিকটা জোরেই বলল , “ আসলে সেদিন পার্লামেন্টের মিউজিয়ামে বক্সটা আপনি ইচ্ছে করেই খালি রেখেছিলেন আর যে যে কথা বলেছিলেন তা রাজেশেরই কথা মত বেশ উঁচু স্বরে । কী রাজেশ ভাই ?”
এতক্ষণ পর রাজেশ মুখ খোলেন , “ হাঁ স্যার রাইট । আপনি বলেছিলেন কিন্তু কেন বলেছিলেন তা এখন অনুমান করতে পারছি ।“
মামা আবার বলতে থাকে , “ ভার্গব তোমার ফোন পাওয়ার পর হোম-মিনিস্ট্রিতে তোমাকে না জানিয়ে আরেকটা রেপ্লিকা তৈরী করাতে বলি । টুটুনের ঘরে ইচ্ছে করেই ফোন ট্যাপের ব্যবস্থা করতে দিল্লী পুলিশের সাহায্য করে । সেইমত টুটুনের ঘরে পুলিশকে দিয়েই ফোন করাই , যাতে লোভে পরে নকল ভার্গব ওরফে আদেশ বিস্তা ফোন ট্যাপের মাধ্যমে পুরো বিষয়টা শুনতে পায় । ফল হল , ওর মনে ধারণা দৃঢ় হয় যে আসল কলম আমার কাছেই আছে ।“
সুন্দর সিং সব শুনছিলেন মন দিয়ে । উনি ডান হাত উঠিয়ে বললেন , “ আমার কিছু কথা ছিল । আসল রেপ্লিকাটা কোথায় তাহলে ? “ মামা মুচকি হেসে ভার্গবের দিকে তাকায় , বলে , “ কী ভার্গব আমি বলব , না, তুমি বলবে ?”
টুটুন মামাকে হাত দেখিয়ে বলল , “ সব ক্রেডিট তুমি নিও না মামা , আমি বলছি , কবিতার শেষ লাইনে আছে লেখা , রবির বই অর্থাৎ রবীন্দ্র নাথের মূর্তিতে বইয়ের ভাঁজে ।“
“ সাব্বাস টুটুন , পার্লামেন্টের ভিতর কষ্টিপাথরের যে রবি ঠাকুরের যে মূর্তি আছে সেখানেই রেখেছিলাম । এর কারণও অবিশ্যি আছে । রেপ্লিকার খবর ভারতে আসার পর ছড়িয়ে পরে আর আমার আশঙ্কাও ছিল । আমি চেয়েছিলাম যারা এটা রটায় তাদের মূল উদ্দ্যেশ্য কী সেটা ধরার । তাই তোমার মামার সাহায্য চেয়েছিলাম ।“ ভার্গব এক শ্বাসে বলে যান ।
“ কিন্তু মামা , ভার্গব আঙ্কেলের চেহারা নকল করে আদেশ বিস্তা মাস্ক বানায় আঙ্কেলকে বদনাম করার জন্য । মজার বিষয় হল লোকটার সোনার বাঁধানো দাঁত । কথা বলতে গেলে গোঁফের তলায় ওটা ঝকঝক করে উঠছিল ।“ টুটুন মামার দিকে তাকিয়ে বলে ।
“ ঠিক । অতি লোভ মানুষের পতনেরই কারণ । বেচারা দীর্ঘদিন মিউজিয়ামে কাজ করে ভার্গবের বিশ্বাসভাজন হওয়ার সুযোগ নিয়েছিল । বাই দ্য ওয়ে , সুন্দর সিং কে বলতে পারিস টুটুন ?” মামা টুটুনের দিকে তাকায় ।
“ কবিতা অনুসারে , যোধপুরের প্রাচীন নাম সূর্যনগরী , ইদ্রপ্রস্থ হল দিল্লীর অপর নাম । তোমার বলা ইতিহাসের গল্প অনুযায়ী মহারাজ হনুওয়ান্ত সিং ১৯৪৮ সালে স্কটিশ নার্স স্যান্ড্রা ম্যাকব্রিডকে প্রথা-বহির্ভূত বিবাহ করেন । নাম দেন সুন্দরা দেবী । পোড়া ভাগ্য সুন্দরার কারণ রাজা তাকে ত্যাগ করে মুসলিম অভিনেত্রী জুবেদাকে বিবাহ করেন । সুন্দরা ইংল্যান্ডেই থেকে যান । আর তার ইতিহাস আমরা পাই না । “
“ একদম ঠিক এগোচ্ছিস । ভার্গব এখানে আসতে বলার একদিন পরেই আমি ব্রিটেনে হাই কমিসনে কৌতূহলবশত ফোন করে জানতে পারি , ভারত ছাড়ার পর মাউন্টব্যাটেন দেখা করেন স্যান্ড্রার সাথে । স্যান্ড্রা আর তার পালিত পুত্র সুন্দরকে জানা অভিজ্ঞান স্বরূপ কলমের কথা । তাদের উত্তরাধিকার করে যান ।“
কথা যখন শেষ হল তখন ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত ১০টা । মামার আবদারে সকলেই ডিনার একসাথে করলেন । হোটেল ছাড়ার আগে সুন্দর সিং বললেন , “ মামাজী পরশু আমার সাথে চলুন না যোধপুর , আবার যদি আরেকটা রহস্য অভিযান হয়ে যায় ।“ মামা হো হো করে হেসে উঠলো ।। ( সমাপ্ত )

পবিত্র চক্রবর্তী

 

0 Comments | 0 Claps

All Prose

Events

Surojit Online

কবিতাক্লাব ডট কম

এই তো সেদিন, ফেসবুকের পেজে লিখলাম একটা লাইন , “আর ভাল্লাগেনা তোমায় ছাড়া।”বন্ধুদের বললাম, সবাই মিলে কবিতা লিখলে কেমন হয়? হঠাৎ দেখি , চার পাতার একটা কবিতা তৈরি হলো, একেবারে চোখের সামনে, সব বন্ধুদের লেখা, মিলিয়ে মিলিয়ে।

See BLOG Read More

Search Writing

 

Search Writer By

 

Statistics

Number of VISITORS : 395305

REGISTERED USERS :

Number of Writers : 1503

Total Number of Poems : 23526

Total Number of Prose : 650

An Initiative By Surojit O Bondhura Kobita Club
Official Radio Partner

Designed and Developed by : NOTIONAL SYSTEMS